এন্টিবায়োটিকযুক্ত খাদ্যকে ‘না’ বলুন

খাবার আমাদের শরীরে পুষ্টি যোগায়, ৰয় পূরণ করে, কাজে ও লেখাপড়ায় শক্তি দেয় এবং নতুন টিস্যু তৈরি করে৷ বেঁচে থাকার জন্য খাবার অপরিহার্য৷ এন্টিবায়োটিক বিজ্ঞানের যুগানত্মকারী আবিষ্কার, যা রোগজীবাণুকে মেরে ফেলে৷ তাই জীবাণুর দ্বারা আক্রানত্ম হলে আমরা সেই সেই জটিল অসুখ সারাতে ওষুধ হিসেবে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করি৷ এই এন্টিবায়োটিক আবার যেমন খুশি ব্যবহার করা যাবে না৷ এর ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে৷ নিয়ম ভেঙ্গে ব্যবহার করলে তা শরীরের মারাত্মক ৰতি করে৷ এই ৰতির তালিকা দীর্ঘ৷ সবচেয়ে কম ৰতি এলার্জিক বিক্রিয়া থেকে শুরম্ন হয়ে বেশি ৰতি গুরম্নত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহ, যেমন কিডনী লিভার ইত্যাদি, বিকল হয়ে কালক্রমে মৃত্যুবরণ করা৷ এসব ৰতি দৃশ্যমান৷ কিন্তু নীরব অথচ মারাত্মক আরেকটি ৰতি হলো জীবাণুর ‘এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স’ তৈরি হওয়া অর্থাত্‍ জীবাণুগুলোর এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে যাওয়া৷ এর ফলে চিকিত্‍সক সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করে সঠিক এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করলে এবং রোগী সঠিক মানসম্পন্ন সেই এন্টিবায়োটিকটি সঠিকভাবে সেবন করলেও রোগের কারণ যে জীবাণুটি তা মরবে না, বরং তার নিয়মে বংশ বিসত্মার করে যাবে৷ এর ফলস্বরূপ সংক্রমণটি ক্রমাগত বাড়তে থাকবে, অত্যনত্ম নামীদামি হাসপাতালে গেলেও কোনো কাজ হবে না৷ রোগের এক পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে রক্তের মাধ্যমে জীবাণুটি শরীরের সর্বত্র সংক্রমণের বিসত্মৃতি ঘটাবে, সেপটিসেমিয়া অর্থাত্‍ রক্তের মারাত্মক সংক্রমণ ঘটবে, একের পর এক অঙ্গ বিকল হতে থাকবে, মাল্টিঅর্গান ফেলিউর হয়ে একসময় রোগী মারা যাবে৷ এই এন্টিবায়োটিক-রেসিস্ট্যান্স একটি জীবাণুর কারণে না হয়ে একাধিক জীবাণুর কারণেও হতে পারে, অধিকাংশ ৰেত্রে তাই ঘটে থাকে৷ আবার এই জীবাণুগুলোর রেসিস্ট্যান্স একটিমাত্র এন্টিবায়োটিকের বিরম্নদ্ধে না হয়ে একাধিক বা বহুবিধ এন্টিবায়োটিকের ৰেত্রেও ঘটতে পারে, তখন একে বলা হয় ‘মাল্টি-ড্রাগ রেসিন্ট্যান্স’, যা ভয়াবহ৷

এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বিবিধ কারণে হতে পারে৷ প্রধান করণটি হলো জীবাণুকে মারার জন্য যে পরিমাণ এন্টিবায়োটিক প্রয়োজন তার চেয়ে কম পরিমাণে এন্টিবায়োটিক সেবন৷ তাছাড়া মানবদেহে ঘনঘন বা অধিক পরিমাণে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার, এন্টিবায়োটিক পুরো কোর্স সম্পন্ন না করা, কয়েকদিন ব্যবহারের পর একটু ভালো বোধ করলে আর সেবন না করা, নকল ভেজাল বা নিম্নমানের এন্টিবায়োটিক সেবন করা ইত্যাদিও অন্যতম কারণ৷ এসব কারণে যাতে এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স তৈরি না হয় তার জন্য বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতেই চিকিত্‍সকগণ রোগীদেরকে সুনির্দিষ্টভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন৷ উপরন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার সদস্য দেশসমূহের সরকারগুলোর মাধ্যমে এসব বিষয়ে রোগীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যও নানাবিধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন৷ বাংলাদেশেও এরকম কর্মসূচি রয়েছে৷ কিন্তু আমাদের একটি অন্যতম সমস্যা হলো এন্টিবায়োটিক উত্‍পাদনের প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা না থাকা সত্ত্বেও ওষুধ প্রশাসন কতর্ৃক শতাধিক ওষুধ কোম্পানিকে এন্টিবায়োটিক উত্‍পাদনের লাইসেন্স দেওয়ার কারণে তারা যুগ যুগ ধরে যেসব নিম্নমানের এন্টিবায়োটিক উত্‍পাদন করছে তার ফলে আমাদের দেশে জীবাণুর এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স মারাত্মক হারে বেড়ে এখন এটি একটি অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপানত্মরিত হয়েছে৷ সরকারের ঐকানত্মিক আগ্রহ থাকার পরেও সংশিস্নষ্ট অফিসগুলোর কারো কারো অদৰতা ও অনৈতিকতা জনস্বাস্থ্যের কী বিরাট ৰতি করতে পারে এটি তার একটি উদাহরণ৷

কিন্তু এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স তৈরির ৰেত্রে সম্প্রতি যে আরো একটি নতুন ও ভয়াবহ কারণ যোগ হয়েছে, তাহলো খাবারের মধ্যে এন্টিবায়োটিকের অনুপ্রবেশ৷ বাংলাদেশে এই অনুপ্রবেশ ঘটছে তিনভাবে৷ প্রথমত, আমাদের মাংস দুধ ও মাছের খামারিরা তাদের অসুস্থ পশু ও মাছকে চিকিত্‍সা করার জন্য এন্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার করছে৷ দ্বিতীয়ত, ফিড ম্যানুফ্যাকচারার অর্থাত্‍ পশুখাদ্য ও মাছের খাদ্যের উত্‍পাদকরা পশু ও মাছের রোগ প্রতিরোধের নামে তাদের ফিডে কোনো যুক্তি ছাড়াই এন্টিবায়োটিক মেশাচ্ছে৷ আর তৃতীয়ত, পরিবেশ দূষণের কারণে খাবার পানির মধ্যে অতি সামান্য পরিমাণে এন্টিবায়োটিক মিশে যাচ্ছে৷

খামারগুলোতে গরম্ন ছাগল মুরগি অসুস্থ হতেই পারে৷ এসব অসুস্থতার অনেকগুলোই জীবাণুর আক্রমণের কারণে ঘটতে পারে৷ সেগুলোর চিকিত্‍সার জন্য এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই৷ কিন্তু সেগুলো নিতে হবে প্রাণিচিকিত্‍সার জন্য সুনির্দিষ্ট করা এন্টিবায়োটিকগুলোর মধ্য থেকে, কোনো অবস্থাতেই মানবচিকিত্‍সায় ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক থেকে নয়৷ কিন্তু দুঃখের বিষয়, কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানি ও প্রাণিচিকিত্‍সক মানুষের চিকিত্‍সায় নির্দেশিত এন্টিবায়োটিকের অনেকগুলোই যথাক্রমে অতি মুনাফার লোভে ও দ্রম্নত আরোগ্যের জন্য নিয়মবিরম্নদ্ধভাবে প্রাণিচিকিত্‍সায় ব্যবহার করছেন৷ এসব এন্টিবায়োটিক রোগ সারার বহু পরেও প্রাণির শরীরে কিছু পরিমাণে থেকে যায়৷ ফলে এসব পশুর মাংস বা দুধ কিংবা মাছ খেলে মানব শরীরে সামান্য পরিমাণে এন্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করে রেসিস্ট্যান্স সৃষ্টি করে৷ পরবর্তীতে সেই মানুষটি কোনো জীবাণু সংক্রমণে অসুস্থ হওয়ার প্রেৰিতে সেই এন্টিবায়োটিক চিকিত্‍সক-নির্দেশিত মাত্রায় খেলেও কোনো কাজ হয় না৷

এন্টিবায়োটিক কখনোই কোনো রোগ প্রতিরোধ করতে পারে না, রোগ হয়ে গেলে সেই জীবাণুকে মারতে পারে৷ অথচ আমাদের দেশে ও বিদেশে ক্যাটল ফিড, পোল্ট্রি ফিড ও ফিস ফিডের অনেক কোম্পানি তাদের উত্‍পাদিত ফিডগুলোতে অনাবশ্যকভাবে প্রাণিদেহ ও মানবদেহে ব্যবহার্য উভয় ধরনের এন্টিবায়োটিক মেশাচ্ছে৷ তারা বলে এর ফলে নাকি গরম্ন-ছাগল-হাঁস-মুরগি-মাছের অসুখ হওয়ার হার কমে যায় এবং এগুলোর স্বাস্থ্য ভালো হয়, অথচ এসব দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই৷ বরং কোনো অসুখ ছাড়া সামান্য পরিমাণে এন্টিবায়োটিক প্রাণিখাবারে মিশিয়ে দেওয়ার ফলে এসব প্রাণির শরীরে এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট জীবাণু জন্মাচ্ছে৷ এগুলো খেয়ে কিংবা এসব প্রাণির সংস্পর্শ, রক্ত ও বিষ্ঠার মাধ্যমে এসব রেসিস্ট্যান্ট জীবাণু মাটি ও পানিকে দূষিত করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে – মানুষের শরীরেতো বটেই৷ শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে, রেসিস্ট্যান্ট জীবাণুগুলোর জিন কোডিং এন্টিবায়োটিক-সংবেদনশীল জীবাণুগুলোর শরীরে প্রবেশ করে সেগুলোকেও রেসিস্ট্যান্ট করে দিচ্ছে৷ এভাবে কোম্পানিগুলো নিজেরা মোটা অঙ্কের মুনাফা করছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের দেহে বিপজ্জনক এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স সৃষ্টি করে জনস্বাস্থ্যের বিপুল ৰতি করছে৷

মাংস, দুধ ও মাছের উত্‍পাদন বাড়ানোর নামে সারা পৃথিবীতেই এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বেড়ে যাওয়ার ৰেত্রে উপর্যুক্ত কারণ দু’টি আজ বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে৷

খাবার পানির উত্‍সগুলোতে এন্টিবায়োটিক মিশে যাচ্ছে যেসব কারণে তার মধ্যে রয়েছে, (এক) এন্টিবায়োটিক ব্যবহারকারী মানুষের বর্জ্য পৌর কতর্ৃপৰ কতর্ৃক রাসায়নিক দিয়ে পরিশোধন না করে নদীতে বা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ফেলা, (দুই) রোগীদের অব্যবহৃত কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ এন্টিবায়োটিক ড্রেনে বা আবর্জনার বিনে ফেলে দেওয়া এবং (তিন) যেসব ওষুধ কোম্পানির উপযুক্ত বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট পস্ন্যান্ট – ইটিপি) নেই তাদেরকেও ওষুধ প্রশাসন কতর্ৃক এন্টিবায়োটিক উত্‍পাদনের অনুমতি দেওয়ার ফলে তাদের কারখানার বর্জ্যগুলো খালে-বিলে-নদীতে কিংবা পৌর কর্পোরেশনের ড্রেনে সরাসরি ফেলে দেওয়া৷ এভাবে পরিবেশে নিঃসৃত এন্টিবায়োটিক ভূ-উপরিস্থ খাবার পানির উত্‍সে মিশে যাচ্ছে, এমনকি ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলোকেও স্পর্শ করছে৷ অতি সামান্য পরিমাণে হলেও এসব এন্টিবায়োটিক তাই খাবার পানির মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে৷

প্রাণিসম্পদে ব্যবহারের কারণে আমাদের খাবারে মিশে যাওয়া এন্টিবায়োটিকের পাশাপাশি খাবার পানিতে অতি সামান্য এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি এখন একটি বৈশি্বক সমস্যায় রূপ নিয়েছে, যদিও দেশে কিংবা বিদেশে এবিষয়ে গবেষণা ও আলোচনা অত্যনত্ম কম৷ মানবচিকিত্‍সার জন্য নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিকগুলো প্রাণিসম্পদে ব্যবহৃত হওয়ার সমস্যাটিই আজ বিশ্বব্যাপী বড় সংকট সৃষ্টি করেছে এবং বিজ্ঞানীরা এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজছেন৷ এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের এই সংকট এখনই থামানো বা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পৃথিবীময় সমগ্র মানব-সভ্যতা অদূর ভবিষ্যতে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং কোনো জটিল সংক্রমণ নয় বরং অতি সাধারণ সংক্রমণেই মানুষ মারা যেতে থাকবে, কারণ কোনো এন্টিবায়োটিকই তখন আর কার্যকর থাকবে না৷ আমাদের বেঁচে থাকার স্বার্থেই তাই আমাদের এন্টিবায়োটিকগুলোকে বাঁচানো প্রয়োজন৷

আজকের পৃথিবীতে যত এন্টিবায়োটিক আছে তার প্রায় অর্ধেকই প্রাণিসম্পদের চিকিত্‍সা ও ‘মোটাতাজাকরণে’ ব্যবহার করা হচ্ছে৷ জনস্বাস্থ্য রৰার জরম্নরি প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পৃথিবীর ৫১টি দেশ প্রাণি মোটাতাজাকরণে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও এখনো অনেক দেশ এমনকি সবচেয়ে অগ্রসর বলে দাবীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উত্‍পাদকদের পুঁজির দাপটে এখনো তা নিষিদ্ধ করা হয়নি, যদিও রাষ্ট্রটি স্বীকার করেছে যে অধিক হারে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের কারণে তাদেরকে চিকিত্‍সা ৰেত্রে প্রতি বছর অতিরিক্ত ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়৷

এই বৈশি্বক সংকটের প্রেৰিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের বিরম্নদ্ধে সচেতনতাকে বেছে নেয় এবং প্রাণিদেহে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানায়৷ পরের বছরও এই সংস্থা এ বিষয়ে বিশদ রিপোর্ট প্রকাশ করে৷ এসব কর্মকা-ের কারণ হলো এই সত্য যে, এন্টিবায়োটিকগুলো প্রকৃতিতে অতি ধীরে নষ্ট হয়৷ সালফোনেমাইড, ক্লোইনোলন, টেট্রাসাইক্লিন ও কিছু ম্যাক্রোলাইড এজন্য সুবিদিত৷ অন্যান্য অনেকগুলো এন্টিবায়োটিকের অবস্থাও তথৈবচ৷ তবে এমাইনোগস্নাইকোসাইড এবং বিটা-ল্যাকটামগুলো সহজেই নষ্ট হয়৷ অর্থাত্‍ অধিকাংশ এন্টিবায়োটিকই প্রকৃতিতে সহজে বিনষ্ট হয় না বলে এগুলো থেকে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স সৃষ্টির আশংকা অনেক বেশি৷ তাই এন্টিবায়োটিক অত্যনত্ম হিসেব করেই ব্যবহার করা উচিত৷

অথচ তা হচ্ছে না৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৫ সালে সারা পৃথিবীতে ৬৩,২০০ টন এন্টিবায়োটিক প্রাণিদেহে ব্যবহৃত হয়েছে৷ এই হারে চললে ২০৩০ সালে যা ১,০৫,৬০০ টনে গিয়ে দাঁড়াবে৷ আর এর ফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে তা যে কত ভয়াবহ তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পরিসংখ্যানই বলে দেয়৷ সেখানে প্রতি বছর প্রায় ২০ লৰ লোক এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স সমস্যায় আক্রানত্ম হয় এবং এদের মধ্যে প্রায় ২৩ হাজার লোক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর সংক্রমণে মারা যায়৷ রেজিস্টেন্সের কারণে এন্টিবায়োটিকগুলো ক্রমাগত তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে বলেই এমনটি ঘটছে৷

বাজারে প্রচলিত এন্টিবায়োটিকগুলোর কার্যকারিতা হারানোর পাশাপাশি কিছুটা আশার বাণী থাকতে পারতো যদি বিজ্ঞান নতুন নতুন এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার করতো৷ কিন্তু তাও হচ্ছে না৷ ওষুধের গবেষণা ও নতুন ওষুধ আবিষ্কার নিয়তই চলছে৷ কিন্তু সেগুলো বড়লোক দেশগুলোর অসুখ ও বিশ্ব বাজারকে বিবেচনায় নিয়ে৷ এই বিবেচনায় এন্টিবায়োটিক এখনো বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই৷ তালিকায় বরং আছে যৌন সমস্যা, টাক পড়া, স্থুলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদির ওষুধ৷ চলমান এন্টিবায়োটিকগুলো একে একে কার্যকারিতা হারালে এবং নতুন এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার না হলে পৃথিবীর মানুষ দাঁড়াবে কোথায়?

মানব সভ্যতার এই ভীষণ বিপদকে মাথায় নিয়ে সারা বিশ্বে সচেতনতা সৃষ্টির লৰ্যে জাতিসংঘ এবছরের বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসে প্রতিপাদ্য হিসেবে “এন্টিবায়োটিকযুক্ত খাবারকে ‘না’ বলুন” শেস্নাগানকে গ্রহণ করেছে৷ এছাড়া এবছরের সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণের বাসত্মব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্দেশ্যে উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠক ডাকা হয়েছে৷ সেখানে মানবদেহে এন্টিবায়োটিকের অধিক ব্যবহার বন্ধ করা এবং নতুন এন্টিবায়োটিকের আবিষ্কারে সচেষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পশুপালন ও মাছ চাষে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার এজেন্ডাও রয়েছে৷

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘ চাইছে এই গুরম্নতর সংকটের মোকাবেলায় সদস্য দেশসমূহের সরকারগুলো বলিষ্ঠ ও বাসত্মবনিষ্ঠ কর্মপন্থা গ্রহণ করম্নক৷ বিশেষ করে পশু, হাঁস-মুরগি ও মাছ চাষের সময়ে ‘রোগ প্রতিরোধমূলক’ ও ‘মোটাতাজার’ কাজে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হোক৷ যদি পশু, হাঁস-মুরগি ও মাছ রোগাক্রানত্ম হয় তাহলে তাদেরকে প্রাণিদেহের জন্য নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিকগুলো দিয়েই চিকিত্‍সা করা হোক, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মানবদেহে ব্যবহার্য এন্টিবায়োটিক দিয়ে নয়৷ জাতিসংঘ আরো প্রত্যাশা করছে যে, এই কাজে শুধু সরকার নয় বরং বেসরকারি উদ্যোগও সক্রিয় হোক৷ শিৰা প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, চিকিত্‍সক, ফার্মাসিস্ট, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবক, এনজিও, খাদ্য উত্‍পাদক, খাদ্য ব্যবসায়ী হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং ভোক্তারাও সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হোক৷ মানব-সভ্যতাবিনাশী মানবসৃষ্ট এই মহাসংকটে সবাই যার যার অবস্থান থেকে জোরালো ভূমিকা পালন করম্নক৷

সারা বিশ্বে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা ‘কনজিউমার্স ইন্টারন্যাশনাল’ এই সংকটে গত কয়েক বছর ধরেই ভূমিকা রাখা শুরম্ন করেছে৷ তারা প্রথম ধাপ হিসেবে বিশ্বজুড়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করা সর্ববৃহত্‍ তিনটি প্রতিষ্ঠান ম্যাকডোনাল্ড, সাবওয়ে এবং কেএফসি-কে আহ্বান জানিয়েছে ঘোষণা করতে যে তারা এমন কোনো গরম্ন, শূকর বা মুরগির মাংস ব্যবহার করবে না যাতে মানব-চিকিত্‍সায় ব্যবহৃত কোনো এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছে৷ এই তিনটি প্রতিষ্ঠান যদি এই নিশ্চয়তা দেয় তাহলে অন্য খাদ্য ব্যবসায়ীদের ৰেত্রেও তা বিরাট প্রভাব ফেলবে৷ কারণ সারা পৃথিবীতে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের শাখা আছে এক লৰেরও বেশি৷ এই আহ্বানের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করে তাদের কাছ থেকে অল্প হলেও কিছু সারা মিলেছে৷

গত বছর বিভিন্ন দেশের আরো ১৯টি ভোক্তা সংগঠন উপর্যুক্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানের জাতীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে একই অনুরোধ পাঠায়৷

গত বছরের মার্চে ম্যাকডোনাল্ড ঘোষণা করেছে যে, আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেস্টুরেন্টগুলোতে তারা এন্টিবায়োটিক খাওয়ানো হয়েছে এমন মুরগির মাংসের ব্যবহার বন্ধ করবে৷ তারপর অক্টোবরে (২০১৫) তারা কানাডার জন্যও এমন ঘোষণা দিয়েছে৷ অন্যান্য দেশের শাখাগুলোর ব্যাপারে তারা এখনো কিছু বলেনি, যেমন দেয়নি মুরগি ছাড়া অন্যান্য মাংসের বেলাতেও এমন কোনো নিশ্চয়তা৷ সারা পৃথিবীর ১০০টি দেশে তাদের দোকান রয়েছে ৩৬,০০০টি৷

একইভাবে সাবওয়ে অক্টোবর ২০১৫-তে জানিয়েছে যে তারা ২০১৬ অর্থাত্‍ এ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত তাদের সব দোকানে কখনো এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়নি এমন মুরগির মাংস ব্যবহার করবে৷ এ বছর তারা এরকম টার্কির মাংসও চালু করবে৷ তবে এরকম শূকর ও গরম্নর মাংস চালু করতে সময় লাগবে ২০২৫ সাল পর্যনত্ম৷ সারা পৃথিবীর ১১১টি দেশে তাদের দোকান রয়েছে ৪৪,৫৮৯টি৷

তবে কেএফসি এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি৷ সারা পৃথিবীর ১১৫টি দেশে তাদের দোকান রয়েছে ১৯,৪২০টি৷

উপর্যুক্ত তিনটি ছাড়াও কনজিউমার্স ইন্টারন্যাশনাল আরো যেসব খাদ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুরোধ পাঠিয়েছিল সেগুলো হলো বার্গার কিং (সুইডেন ও জার্মানি), হেসবার্গার (ফিনল্যান্ড), ম্যাঙ্ (সুইডেন), নন্দস্ (দৰিণ আফ্রিকা), পিত্‍জা হাট (জার্মানি), কুইক (বেলজিয়াম) এবং ভাপিয়ানো (জার্মানি)৷ তারা উত্তরে জানিয়েছে যে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে, তবে সুনির্দিষ্ট কিছু এখনো বলেনি৷

এই বড় আনত্মর্জাতিক চেইন রেস্টুরেন্টগুলোর কাছে অনুরোধ পাঠানোর কারণ হলো তাদের রয়েছে বিশাল ক্রয়শক্তি যা দিয়ে ব্যবসা ও মুনাফার পাশাপাশি তারা মানুষের কল্যাণে একটি ব্যাপক প্রভাব রাখতে পারে, তাদের দেখে অন্য ব্যবসায়ীরাও এগিয়ে আসতে পারে এবং তারা তাদের গৃহীত এই ভালো কাজটির বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে৷ তাছাড়া তাদেরতো সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণেও এটি করা উচিত, কারণ বিশ্বব্যাপী তাদের লৰ লৰ দোকানে রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুযুক্ত মাংস ব্যবহার করে প্রতিদিন তারা কোটি কোটি মানুষের কম ৰতিতো করছে না৷

২০১৪ সালে কনজিউমার্স ইন্টারন্যাশনাল এক হিসেবে জানিয়েছে যে, জীবাণুর এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের কারণে এখন যে হারে মানুষ মারা যাচ্ছে তা কমানো বা বন্ধ করা না গেলে ২০৫০ সালে এশিয়া মহাদেশে ৪৭ লৰ ৩০ হাজার, আফ্রিকাতে ৪১ লৰ ৫০ হাজার, দৰিণ আমেরিকাতে ৩ লৰ ৯২ হাজার, ইউরোপে ৩ লৰ ৯০ হাজার, উত্তর আমেরিকাতে ৩ লৰ ১৭ হাজার এবং ওসেনিয়াতে ২২ হাজার মানুষের এই কারণে মৃত্যুর আশংকা রয়েছে৷ এদের মধ্যে আবার অধিকাংশই হলো শিশু, গর্ভবতী মহিলা, বৃদ্ধ এবং রোগ প্রতিরোধ ৰমতা কমে যাওয়ার বিভিন্ন অসুখে আক্রানত্ম রোগীরা৷

বৈশি্বক মেগা পুঁজি শিশুদেরও নিষ্কৃতি দেয়নি৷ গত ২২ মে ২০১২ তারিখে যুক্তরাজ্যের ডেইলি মেইল পত্রিকায় প্রখ্যাত সাংবাদিক রব ওয়াহ জানিয়েছেন, শিশুদের বেবী ফুডেও প্রাণিদেহে ব্যবহার করা এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে৷ কোম্পানিগুলোর মতে পরিমাণটি সামান্য হলেও বিজ্ঞানীরা সরকারের কাছে এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের দাবী জানিয়েছেন৷

এই বৈশি্বক সংকটে আসুন বাংলাদেশে আমরা সচেতন হই, এই নৈরাজ্যের পরিবর্তনে সোচ্চার হই এবং সবকিছু সরকারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে এ বিষয়ে ভূমিকা রাখি৷ বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মদের স্বার্থে আসুন দাবী করি সরকার যেন এ বিষয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন করেন, আইন কার্যকর করেন এবং আইন ভঙ্গকারীদের দৃষ্টানত্মমূলক শাসত্মি দেন৷ আসুন আমরা মানব ও প্রাণিদেহে এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও অধিক ব্যবহার বন্ধ করি, এন্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করি, মানবদেহে ব্যবহার্য কোনো একটি এন্টিবায়োটিকও প্রাণিদেহে ব্যবহার না করি, কোনো অবস্থাতেই ‘রোগ প্রতিরোধের জন্য’ প্রাণিদেহে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার না করি, এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় পুরো কোর্স সম্পন্ন করি এবং যেসব ওষুধ কোম্পানি এন্টিবায়োটিক উত্‍পাদনের সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স পেয়েছে তাদের এন্টিবায়োটিক উত্‍পাদনের লাইসেন্স বাতিল করি৷

আমরা চাইলে কিন্তু পারি৷ বর্তমান সরকার বিভিন্ন ৰেত্রে জনগণকে যে সাফল্য উপহার দিতে পেরেছেন তার কিছু কিছু আমরা জানি৷ কিন্তু অনেক তথ্যই আমরা পাই না বা লৰ্য করি না৷ এমনি একটি ছোট্ট কিন্তু অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ এবং আমাদের আজকের আলোচনার জন্য সম্পর্কিত একটি তথ্য চোখে পড়েছিল ৯ ফেব্রম্নয়ারি ২০১৬ দৈনিক ভোরের কাগজের অনেক ভেতরের পাতায়৷ সেখানে জানা যায় যে, গাজীপুরের শ্রীপুরস্থ মুরগির মাংস উত্‍পাদনকারী খামারিরা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করে নিরাপদ মাংস উত্‍পাদনের অঙ্গীকার করেছেন৷ কারণ তারা সরকারি উদ্যোগে এন্টিবায়োটিক-মুক্ত নিরাপদ মাংস উত্‍পাদনের প্রচেষ্টা নিয়ে শুধু সফলই হননি, বরং আগের চেয়ে বেশি মাংস উত্‍পাদন করতে পারছেন৷ শুধু তাই নয়, তারা খামারে পরিমিত ওষুধ ব্যবহার করায় আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন৷ এ ব্যাপারে খামারিদেরকে প্রশিৰণ দিয়েছেন প্রাণিসম্পদ সেবা পরিদপ্তর (ডিএলএস – ডিরেক্টরেট অব লাইভস্টক সার্ভিসেস) এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস৷ এতকাল খামারিরা নিজেদের অজানত্মে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্ররোচনায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে স্বাস্থ্যঝুঁকিসম্পন্ন মাংস উত্‍পাদন করেছেন এবং আর্থিকভাবেও ৰতিগ্রসত্ম হয়েছেন৷ তাই সরকার নিরাপদ ব্রয়লার মাংস উত্‍পাদন প্রকল্পের আওতায় কিছু খামারিকে প্রশিৰণ দেয়৷ খামারিরা জানিয়েছেন, আগে তারা এক হাজার মুরগির জন্য ১৫-১৮ হাজার টাকার ওষুধ কিনতেন৷ কিন্তু এন্টিবায়োটিক-মুক্ত মুরগি পালনের প্রশিৰণ পাওয়ার পর এখন লাগে মাত্র ৪-৫ হাজার টাকা, ফলনও হয় বেশি৷ গাজীপুর জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন উপজেলায় পর্যায়ক্রমে এন্টিবায়োটিক ওষুধমুক্ত ব্রয়লারের মাংস উত্‍পাদনে এই প্রশিৰণ অব্যাহত রাখবেন৷

সরকার, প্রাণিসম্পদ সেবা পরিদপ্তর, গাজীপুর জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসকে ধন্যবাদ জানাই একটি বড় সংকটের আংশিক সমাধানে এই পথপ্রদর্শক উদাহরণ রাখার জন্য৷ উপরোলিস্নখিত অন্যান্য বিষয়গুলোতেও আমরা সরকারের এ ধরনের পজিটিভ ভূমিকা প্রত্যাশা করি৷ গত কয়েক বছরে জনস্বাস্থ্য রৰায় বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আনত্মর্জাতিক মহল থেকে প্রচুর প্রশংসা পেয়েছে৷ এই বৈশি্বক সমস্যা নিরসনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে আমরা আবারও জাতিসঙ্ঘের প্রশংসা পেতে চাই৷

আ ব ম ফারুক
অধ্যাপক, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ
সাবেক ডীন, ফার্মেসি অনুষদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: abmfaroque@yahoo.com

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s